Power and Energy: People Suffering Against Development Fallacy

আওয়ামী লীগ সরকার বিগত ১৪ বছর ধরে বিভিন্ন দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধীমত দমন ও জনগণের বাকস্বাধীনতা হরণের অভিযোগের বিপরীতে বারবার বিভিন্ন উন্নয়নের বুলি প্রচার করেছে। জাতীয় নির্বাচনসহ অসংখ্য প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রকে এক গভীর সংকটের মাঝে ফেলে যে ধারা দলটি নিয়ে এসেছে, তাকে আওয়ামী লীগ বলেছে ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’। এই তথাকথিত উন্নয়নের গণতন্ত্রের একটি প্রধান স্তম্ভ ছিল দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অভাবনীয় সাফল্যের দাবি। দেশে চাহিদার তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শতভাগ বিদ্যুতায়নের মতো আকর্ষণীয় বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে বেশ জোরেশোরে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে চলমান বিভিন্ন দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র সামনে আসার পর এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, ১৪ বছর ধরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে অভাবনীয় উন্নয়নের দাবি করা হচ্ছিল, তার মাঝে রয়েছে এক বিরাট শুভংকরের ফাঁকি। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের তীব্র সংকটের পর এখন শহরাঞ্চলেও সরকারিভাবে ঘোষণা দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হচ্ছে। সরকারের তরফ থেকে প্রায় ২৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার দাবি করা হলেও দৈনিক চাহিদার মাত্র সাড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎও উৎপাদন করতে পারছে না কেন্দ্রগুলো। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এই বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের কথা বলে জনগণের ট্যাক্সের যে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হলো, তার ফলাফল এমন কেন হলো?  

কোন খাতে খরচ হলো জনগণের টাকা?

সম্প্রতি অ্যান্টি করাপশন এভিডেন্স রিসার্চ কনসোর্টিয়ামের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সাথে যোগসাজশে উচ্চ দামে বিদ্যুৎ কিনে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি হয়েছে। এই গবেষণায় আরও বলা হয়, রাজনৈতিক যোগসাজশের মাধ্যমে কম খরচের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে উচ্চ মূল্যের কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। এরপর বিদ্যুতের দাম বেশি বলে জনগণের টাকায় দেওয়া হয়েছে ভর্তুকি, যা বাংলাদেশে এক নতুন ধরনের দুর্নীতির প্রবর্তন করেছে। বিদ্যুৎখাতে দুর্নীতির আরেকটি পোশাকি নাম হলো ক্যাপাসিটি  চার্জ। ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরের মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী এবং রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদেরকে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে। এই ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয় সরকারের সাথে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তির ভিত্তিতে। সেই চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্ডার দেওয়া না হলেও কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ৬০ শতাংশ দাম পরিশোধে বাধ্য থাকবে সরকার। এর অর্থ দাঁড়ায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেই বরং এসব কেন্দ্র মালিকদের লাভ বেশি। কারণ কোনো খরচ না করেই যথাসময়ে ৬০ শতাংশ মূল্য পেয়ে যাচ্ছে তারা। এই ক্যাপাসিটি চার্জের সিংহভাগ অর্থও আবার হাতে গোনা কয়েকটি স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পকেটেই যাচ্ছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানো বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩ বছরে পরিশোধ করা মোট ক্যাপাসিটি চার্জের ৩৫ শতাংশই গিয়েছে তিনটি প্রতিষ্ঠানের পকেটে। ইউনাইটেড গ্রুপ, সামিট গ্রুপ ও বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড এই সময়ে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে দেশের বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারি উৎপাদক নির্ভর করে ফেলার ভয়াবহতম দিক এটিই। উল্লেখিত ৩ বছরে এমন বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকরাই পরিশোধ করা মোট ক্যাপাসিটি চার্জের প্রায় ৬০ শতাংশ হিস্যা পেয়েছে। তবে অভিযোগও আছে, ক্যাপাসিটি চার্জের এই টাকা শুধু কেন্দ্র মালিকদের পকেটে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তার ভাগ পৌঁছে যায় সরকারের মন্ত্রী, এমপিদের পকেট পর্যন্ত। যদিও এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে অনেকগুলো আবার তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ব্যর্থ। সরকার যদি তাদের কাছে বিদ্যুতের চাহিদা জানায়, কিন্তু তারা তা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী তাদের সরকারকে একটি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সরকার এসব কেন্দ্রের কাছে কোনো বিদ্যুতের অর্ডার দেয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। যেহেতু অর্ডার নেই, তাই তাদের ক্ষতিপূরণও দেওয়া লাগে না। আবার বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি অনুযায়ী, যদি কোনো কেন্দ্র তার সক্ষমতার ৪০ শতাংশের নিচে উৎপাদন করে, তাহলে সরকার চাইলেই সেগুলো বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু এখানেও এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে। এমন সব বিশৃঙ্খলার মাঝেই নতুন একটি বিষফোঁড়া হিসেবে হাজির হয়েছে ভারতের আদানি গোড্ডা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি। বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এক্সটার্নাল ডেবট ও ভারতভিত্তিক গ্রোথওয়াচের এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদানি গোড্ডার বিদ্যুৎ আমদানিকৃত অন্যান্য বিদ্যুতের তুলনায় ৫৬.২ শতাংশ বেশি ব্যয়বহুল। এতে আরও বলা হয়, কেন্দ্রটির সাথে ২৫ বছরের চুক্তি অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হতে পারে। মনে প্রশ্ন জাগে, দেশেই যখন চাহিদার চেয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি উৎপাদন সক্ষমতা আছে, তখন কেন বেশি দামে ও এত বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করে আদানির বিদ্যুৎ নিতে হচ্ছে? 

রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল: স্বেচ্ছাচারিতা ও অপচয়ের গল্প

বিদ্যুৎ সংকটের কথা বলে ২০১০ সাল থেকেই রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়ে আসছে আওয়ামী লীগ সরকার। প্রয়োজন ফুরানোর পরও এখন পর্যন্ত দফায় দফায় এসব কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়িয়ে চলেছে তারা। স্থাপিত হচ্ছে নতুন কেন্দ্রও। কিন্তু ২০১০ সাল থেকে অধিকাংশ কেন্দ্রই অনুমোদন পেয়েছে কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই। এতে দক্ষ প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়ার বিষয়টি মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত থেকেছে। আবার এমন বেসরকারি কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করে মূলত তেল ও গ্যাস পুড়িয়ে। তাই এগুলোকে যদি দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করতে হয়, তাহলে তাদের এই জ্বালানি রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু তারপরও যখন এসব কেন্দ্রের সাথে চুক্তি হয়েছে, তখন তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার কোনো পরিকল্পনা রাখা হয়নি। বিশ্ববাজার থেকে কেনা জ্বালানির ওপর শুধু একক নির্ভরতা বর্তমানে জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধের অন্যতম কারণ। বিভিন্ন জ্বালানিসমৃদ্ধ রাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতেও জ্বালানি কেনার কোনো ব্যবস্থা করতে পারেনি আওয়ামী লীগ সরকার। এটি তাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও দূরদর্শিতার অভাবের পাশাপাশি টানা কয়েকটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের কারণে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার অভাবেরই ফলাফল।

এছাড়া এসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনাতেও জনগণের ট্যাক্সের টাকা ব্যাপকভাবে অপচয় করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক বেশি দাম দিয়ে বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিদ্যুৎ কিনছে সরকার। একটি পুরনো ডিজেলভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্রের বিবেচনায় হিসাব করলে বিদ্যুতের ট্যারিফ ৮ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও সরকার বেসরকারি কেন্দ্রভেদে ট্যারিফ ধরেছে ১২ টাকা থেকে ১৪ টাকা ৮০ পয়সা। আবার পুরনো ফার্নেসভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্রের বিবেচনায় ট্যারিফ দাঁড়ায় ৬ টাকা ৬০ পয়সা। কিন্তু সরকার ধরেছে ৮ টাকা ৮০ পয়সা। এভাবে ট্যারিফ বেশি দেখিয়ে ভর্তুকি দিয়ে জনগণের অর্থে পকেট ভারী হয়েছে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও এসব কেন্দ্র মালিকদের।         

গোড়ায় গলদ: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিতেই ভুল 

বাংলাদেশে বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে সংকট দৃশ্যমান, তার প্রায় পুরোটায় এই খাত নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতির পরিণতি। সরকারের তরফ থেকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হলেও এই ভুল নীতিগুলোর কারণেই সংকটের শুরু এবং তা একসময় না একসময় দেশের ওপর বোঝা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতোই। এই যেমন বিশ্ব যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পুরোটায় তেল ও আমদানিকৃত এলএনজি গ্যাসনির্ভর করে তোলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে না গিয়ে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দামে এলএনজি কেনা হয়েছে। বর্তমানে দেশে থাকা দুইটি এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার না করে আরও নতুন দুইটি টার্মিনাল তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার, গত চার বছরে এলএনজি আমদানিতে পেট্রোবাংলা খরচ করেছে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এই একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহ, কূপ খনন, অনুসন্ধান ও জরিপে বাপেক্সকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ১ হাজার কোটি টাকা। গভীর সমুদ্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে গ্যাস অনুসন্ধানের কোনো উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। নিজ দেশের অনাবিষ্কৃত গ্যাস সংগ্রহে মনোযোগ না দিয়ে আমদানিতে এত উৎসাহের কী কারণ হতে পারে? নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে না হেঁটে রেন্টাল, কুইক রেন্টাল, কয়লা ও তেল-গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকৃতি বিনাশী প্রকল্প কেন নেওয়া হচ্ছে? মজার ব্যাপার হলো, এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পথও বন্ধ করে রেখেছে আওয়ামী লীগ সরকার। গত বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন, ২০১০ এর মেয়াদ চতুর্থ দফায় বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে। এই আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী, গ্যাস ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজটিকে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দিয়েছে সরকার। অর্থাৎ কারা এসব কেন্দ্রের অনুমতি পাচ্ছে, কী শর্ত মেনে অনুমতি পাচ্ছে, বিদ্যুতের দাম কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে ইত্যাদি কোনো কিছু নিয়েই আদালতে যাওয়া যাবে না। এমনকি বর্তমানে পেট্রোবাংলার জন্য যে আইন হতে যাচ্ছে, সেখানেও এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই ইনডেমনিটি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এমন ঢালাওভাবে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়ার কী কারণ? সাধারণ যুক্তিতেই বোঝা যায়, দুর্নীতি হচ্ছে জন্যই ইনডেমনিটি দেওয়ার প্রয়োজন পড়ছে।    

দাতা সংস্থা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও দায় এড়াতে পারে না

স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এডিবির বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আর এই বিনিয়োগের প্রধানতম খাতই ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যা প্রায় ২৩ শতাংশ। কিন্তু জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিকের একটি উদ্যোগ এই এডিবি তার অধিকাংশ বিনিয়োগই করেছে বাংলাদেশের প্রকৃতি বিনাশী, জলবায়ু হুমকি তৈরিকারী বিভিন্ন প্রকল্পে। রামপাল ও পায়রার মতো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঞ্চালন লাইন নির্মাণে বিনিয়োগ আছে এডিবির। অথচ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করলে এডিবির এই সব প্রকল্পে বিনিয়োগ করা যৌক্তিকতা থাকতো না। এছাড়া বিনিয়োগের মাধ্যমে বেসরকারিকরণকে উসকে দিয়ে এডিবি দেশের বিদ্যুৎ খাতে পাবলিক সেক্টরকে দুর্বল করে ফেলাতে ভূমিকা রেখেছে। আবার বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী জাইকাও প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরিতে। পরিবেশবিদরা এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে বারবার সতর্ক করে আসছেন। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভারতের বিনিয়োগ এবং এর পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টি তো এখন সবারই জানা। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের সদস্য আইএফসি, আইএফসি ইমার্জিং এশিয়া ফান্ড, নেদারল্যান্ডসের এফএমও এর মতো ব্যাঙ্ক ও সংস্থাগুলোও সামিট গাজীপুর-২ পাওয়ার লিমিটেড, বিবিয়ানা-২ ও মেঘনাঘাটের মতো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বিনিয়োগ করে চলেছে। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই সর্বাধিক ক্যাপাসিটি চার্জ নেওয়া ও তেল-এলএনজি ব্যবহার করে পরিবেশবিনাশী উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকরাই রয়েছেন সবার শীর্ষে। তাই বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার জন্য এই দাতা সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের দায় এড়ানোর সুযোগ খুব বেশি নেই।      

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা আসবে কোন পথে?

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার এখনই সময়। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের মতো সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে বিধ্বংসী প্রমাণিত হয়েছে। তাই এমন নীতি থেকে সরে এসে এই খাতকে পুরোপুরি সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি। এজন্য প্রথমেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাতিল করতে হবে সব ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি আইন ও চুক্তি। এই খাত সংশ্লিষ্ট সব সিদ্ধান্ত গণশুনানির মতো জনসম্পৃক্ত পদ্ধতিতে নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা কমাতে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও জরিপ জোরালো করতে হবে। এজন্য বাপেক্সকে শক্তিশালী ও আধুনিকায়ন করে ২১ শতকের জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত করে তুলতে হবে। আমদানিতে নয়, গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জনগণের অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত, বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মনোনিবেশ করতে হবে। ইতিমধ্যে ভারতে অ-জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পাওয়া শক্তি দেশটির মোট উৎপাদনের ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। তারা পারলে আমরা কেন পারবো না? এছাড়া নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের খরচও এখন অনেক কমে গিয়েছে। সৌর প্যানেল ও বায়ু মিলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ২০১০ থেকে ১৯ সালের মধ্যে যথাক্রমে ৮৫ ও ৫৫ শতাংশ কমেছে। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের মাধ্যমেই কম খরচে টেকসইভাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। 

copyright 2022 by tabithawal.com