What needs to be done to lift the sanction on RAB

২০২১ সালের ৩রা নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান মারুফা ইসলাম। মারুফা ইসলাম হয়তো আমাদের অনেকের কাছে তেমন কোনো পরিচিত নাম নয়। তিনি ছিলেন ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মফিজুল ইসলামের স্ত্রী। সেই মফিজুল ইসলাম, যাকে ২০১২ সালের ৮ এপ্রিল রাতে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকেই তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। কোনো থানা, কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই মফিজুলকে গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করেনি। বাংলাদেশে বিগত ১২ বছর ধরে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে চিত্রনাট্য বারবার রচিত হয়ে আসছিল, মফিজুলের ঘটনার ক্ষেত্রেও সেই সাদৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু স্ত্রী মারুফার লড়াই থেমে থাকেনি। গুম হওয়া স্বামীর খোঁজে দুই সন্তানসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, আদালত, সরকারের বারান্দায় ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু স্বামীর সন্ধান পাওয়ার আগেই তার দীর্ঘ ৯ বছরের লড়াই শেষ হলো। তার মৃত্যুর ৪ দিন পর ৭ নভেম্বর একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বড় ছেলে সাইদুল ইসলামকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা চারজন আর এক হতে পারলাম না।’ 

 

মারুফার মৃত্যুর কিছুদিন পরই ১০ ডিসেম্বর গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে র‍্যাব ও এর সাবেক-বর্তমান মিলিয়ে সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

 

অস্বীকারের সংস্কৃতি, বিপরীতে বাস্তবতা

র‍্যাবের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের সাথে সাথেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করার পুরনো পথই বেছে নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। সরকার বলতে থাকে, ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়াতেই হঠাৎ করে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু আসলেই কি বিষয়টি এমন? সর্বশেষ ১২ বছরে মার্কিন মানবাধিকার প্রতিবেদন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন কিন্তু বলছে—হঠাৎ করে নয়, বরং দীর্ঘ সতর্কতার পরই এসেছে এই নিষেধাজ্ঞা। আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের এক বছর পরই ২০১০ সালে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে আসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে র‍্যাবের জড়িত থাকার কথা। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর উদ্বৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ সালের প্রথম ১০ মাসেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ১০৯ জন নাগরিক বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এরপর থেকে প্রতিবছরই হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো প্রভাবশালী সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুম, হত্যা, সাংবাদিক নির্যাতনসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং এগুলোর সাথে র‍্যাবের ওতপ্রোত সংযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘদিন ধরে তাদের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বাংলাদেশে র‍্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপতৎপরতার কথা উল্লেখ করে আসছে। ২০১২ সালে প্রকাশিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনের প্রথমেই র‍্যাবের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়। গুমের অংশে সুনির্দিষ্টভাবে ২০১১ সালের ১৩ই জুন র‍্যাব-১২ এর হাতে গুমের শিকার হওয়া নজরুল ইসলামের কথা পর্যন্ত তুলে ধরা হয়। শুধু ২০১২ নয়, এরপর থেকে প্রতিবছরই প্রকাশিত এই মানবাধিকার প্রতিবেদনে র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে আসছিল দেশটি। এমনকি ২০২০ সালের অক্টোবরে তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে চিঠি দিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে র‍্যাবের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান মার্কিন সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির ১০ সদস্য। তাদের মধ্যে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলের সিনেটররাই আছেন। ২০২১ সালের আগস্টে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাত্র কয়েক মাস আগেও যুক্তরাষ্ট্রের টম ল্যানটস হিউম্যান রাইটস কমিশন আয়োজিত আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের ভার্চুয়াল আলোচনাতে র‍্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আলোচিত হয়। তখন সেই কমিশনের কাছে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে রাষ্ট্রদূত এম শহীদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে দাবি করা হয়, সরকারের অর্জন ম্লান করতেই এমন গুমের মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। অথচ তখনও এই অভিযোগগুলোর ব্যাপারে নিরপেক্ষ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সরকারের কাছে ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার সে পথে হাঁটেনি। বরং বারবার বিভিন্ন সংস্থা, দেশ থেকে প্রকাশিত প্রতিটি প্রতিবেদন তারা অস্বীকার করেছে। ২০২০ সালের ১৩ মার্চ মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মানবাধিকার রিপোর্টকে ‘মোটিভেটেড রিপোর্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। দেশে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের বিষয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অভিযোগের ব্যাপারে ২০২১ সালের ২৭ জুন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এই অভিযোগ কোনো বিশেষ মহলের ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতারই অংশ।’ এমনকি যুক্তরাজ্য সরকারও যখন ২০২১ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘তাদের প্রথমে নিজেদের ফেস দেখা উচিত। তারপর মাতব্বরি করলে ভালো হয়।’ শুধু অস্বীকার নয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে স্ববিরোধী বক্তব্য দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। ২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের টিম সেবাস্টিয়ানের সাথে সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভি বলেন, ‘আমি অস্বীকার করছি না যে গুমের কিছু ঘটনা ঘটার দৃষ্টান্ত নেই।’ এমন স্বীকারোক্তির পরও সেগুলোর তদন্ত নিয়ে কথা না বলে তিনি উন্নয়নের বুলি প্রচার করতে শুরু করেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, গওহর রিজভি যে ‘কিছু গুমের ঘটনা’র কথা বলেছিলেন, অন্তত সেগুলোর তদন্ত হয়নি কেন? স্বীকার করার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ায় নিষেধাজ্ঞা এলে আওয়ামী লীগই বা এত অবাক হচ্ছে কেন? বরং এই ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা হঠাৎ করে আসা কোনো বজ্রপাত নয়, এই নিষেধাজ্ঞা আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাচারিতা ও লাগামহীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিণতি।

 

কেন র‍্যাবের বিরুদ্ধে তদন্ত নয়?

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ ধারাবাহিকভাবে দেশে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করে আসছে। এই তথ্যের উৎস হিসেবে অধিকাংশ সময় তারা বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসা খবরকে ব্যবহার করে। তাই খুব স্বাভাবিক, তাদের প্রকাশিত তথ্যের বাইরেও অনেক গুম-হত্যার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। কিন্তু যদি ‘অধিকার’-এর তথ্যও আমরা আমলে নিই, তাহলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর একটি বিশেষ দিক আমাদের সামনে উন্মোচন হয়। ২০০৯ থেকে ২০১৪ এর মাঝে সবচেয়ে বেশি গুমের ঘটনা ঘটেছে ২০১৩ সালে, সে বছর ৫৪ জন ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন। এর পরবর্তী ৭ বছরে, ২০২১ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গুমের ঘটনা ঘটেছে ২০১৮ সালে, ৯৮ জন। আর ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ২০১৩ সালে। সে বছর ৩২৯ জন নাগরিক দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বিনা বিচারে হত্যার শিকার হয়েছেন। ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যা হয়েছে ২০১৮ সালে। সে বছর ৪৬৬ জন নাগরিক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ২০১৩ ও ২০১৮—দুই সালেই সবচেয়ে বেশি গুম-বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনার বিশেষত্ব কী? এর বিশেষত্ব হলো, এই দুটিই ছিল নির্বাচনের বছর। প্রশ্ন জাগে, নির্বাচনের ঠিক আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কেন গুম-হত্যা বেড়ে যায়? এটা মনে করা কি অযৌক্তিক হবে, নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গুম-হত্যার মাধ্যমে চাপে রেখে নির্বাচনের মাঠ দখলে রাখতে চেয়েছে আওয়ামী লীগ? আর যেহেতু নির্বাচনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আওয়ামী লীগকে সহায়তা করেছে এসব বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা, তাই তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত উন্মোচন করতে পারে অনেক রাঘব-বোয়ালের মুখোশ। শুধু এজন্যই কি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মানবাধিকার সংস্থার চাপ কিংবা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা—কোনো কিছুই র‍্যাবের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তে উৎসাহিত করতে পারেনি সরকারকে?

 

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দূর করতে আওয়ামী লীগ কতটা আন্তরিক?

র‍্যাবের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে আওয়ামী লীগ সরকারের যেমন নিষ্ক্রিয়তা দেখা গিয়েছিল, নিষেধাজ্ঞার পরে এখনও সেই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বারবার সতর্কতার পরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ ঠেকাতে পারেনি তারা। এটিকে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে তাদের অনিচ্ছা ও ভয়াবহ কূটনৈতিক ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবেই দেখা যেতে পারে। সরকারের তরফ থেকে সদিচ্ছা এবং মানবিক-চৌকস বাহিনী হিসেবে র‍্যাবকে গড়ে তোলার সঠিক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিলে এই নিষেধাজ্ঞা হয়তো আসতোই না। সেদিক থেকে ব্যর্থতা তো রয়েছেই, নিষেধাজ্ঞার পরও সরকারের খামখেয়ালি আচরণ বন্ধ হয়নি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলও বারবার বলে আসছে, নিষেধাজ্ঞা ওঠাতে র‍্যাবের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত জরুরি। এজন্য প্রথমত জরুরি অভিযোগগুলো স্বীকার করা। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত কারণগুলো সমাধান না করে দেশের জনগণের টাকায় নিয়োগ করা হয়েছে লবিস্ট। এই লবিস্ট ফার্মের প্রধান কাজই হবে, মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন না করেই নিষেধাজ্ঞা ওঠাতে মার্কিন প্রশাসনের কাছে আওয়ামী লীগের হয়ে তদবির করা। কিন্তু কোনো গঠনমূলক উদ্যোগ আওয়ামী লীগকে নিতে দেখা যায়নি। বরং নিষেধাজ্ঞা দূর করার প্রতিবন্ধক কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুম-হত্যার শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকে নতুন করে হয়রানি করা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাঠিয়ে তাদেরই লেখা জবানবন্দিতে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গিয়েছে। বাতিল করা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে র‍্যাবের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা সংস্থা ‘অধিকার’-এর নিবন্ধন। র‍্যাব সংস্কার, পুনর্গঠনেও কোনো উদ্যোগ এখনও নেওয়া হয়নি। অথচ বাংলাদেশের সুশীল ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এই দাবিটি বেশ পুরোনো। ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি র‍্যাবের সংস্কার ও পুনর্গঠনের কথা জানিয়েছিল। নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুন ঘটনায় র‍্যাবের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের পর ২০১৪ সালে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াও র‍্যাবকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের কথা বলে সংস্থাটি বাতিলের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ এসব কোনো কিছুই আমলে নেয়নি। আর এই আমলে না নেওয়ার পরিণতিই বর্তমান নিষেধাজ্ঞা, যা ক্রমশ বাংলাদেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে চলেছে। ইতিমধ্যে এর ফলস্বরূপ এ বছরের জানুয়ারিতে র‍্যাবকে জাতিসংঘ মিশনে নিষিদ্ধের জন্য চিঠি দিয়েছে ১২টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা।

 

নিষেধাজ্ঞা দূর করতে কী প্রয়োজন?

এটা স্পষ্ট, শুধুমাত্র কূটনৈতিক তৎপরতা দিয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দূর করা যাবে না। আওয়ামী লীগের সেই কূটনৈতিক দক্ষতার ঘাটতিও প্রমাণিত। ২০১৩ সালে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তার অভাবের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা (জিএসপি) বাতিল করা হয়। দীর্ঘ ৯ বছরেও সেই সুবিধা আর ফিরিয়ে আনতে পারেনি আওয়ামী লীগ। অনেকের সন্দেহ, র‍্যাবের ওপরে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও একই পরিণতি ঘটতে চলেছে। কিন্তু সেটা হলে এর ফল হবে মারাত্মক। তাই আওয়ামী লীগকে দ্রুতই কিছু গঠনমূলক উদ্যোগ নিতে হবে, যেন বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে দীর্ঘায়িত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নতুন করে বাংলাদেশ ও এর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত না করতে পারে। এজন্য প্রথমেই আওয়ামী লীগ সরকারের একদম উচ্চ পর্যায় থেকে দেশে ক্রমাগত গুম-হত্যার মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি জনসম্মুখে স্বীকার করতে হবে। এ ব্যাপারটি আর অস্বীকার না করে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, যারাই দেশে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীসহ সাধারণ মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত, তাদের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। দ্বিতীয়ত, অতি জরুরি ভিত্তিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা র‍্যাব কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তদন্তের মুখোমুখি করতে হবে। তৃতীয়ত, র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ তদন্তে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করতে হবে। সেই কমিশনে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী ও ভুক্তভোগী অথবা তাদের পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কমিশনের তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য নিয়মিত বিরতিতে জনগণের কাছে উন্মোচন করতে হবে। চতুর্থত, র‍্যাবের মতো এলিট সংস্থাকে যেন আর দলীয় স্বার্থে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে ব্যবহার না করা যায়, এজন্য র‍্যাবকে প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন করতে হবে। এবং সর্বশেষ, বাংলাদেশকে অবশ্যই জাতিসংঘের গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করতে হবে। ২০১০ সালে জাতিসংঘ গুম বা বলপূর্বক অন্তর্ধান বিরোধী এই সনদ অনুমোদন করলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তাতে স্বাক্ষর করেনি। এর ফলে গুম প্রশ্নে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিসরে এখন পর্যন্ত প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে আছে। 

 

এ বছর ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ সফরে আসেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেত। তিনি তাঁর সফরের প্রায় পুরোটা সময় আওয়ামী লীগ সরকারকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আমলে নিয়ে স্বাধীন-স্বচ্ছ তদন্ত সংস্থা গঠনের কথাও বলেছেন তিনি। তাই মানবাধিকার লঙ্ঘন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, তা এখন আর আওয়ামী লীগের অজানা নয়। এই পদক্ষেপগুলো যত তাড়াতাড়ি বাস্তবায়িত করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত কারণগুলো সমাধান করা হবে, তত দ্রুত নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হবে। কিন্তু শুধুমাত্র দলীয় স্বার্থ বিবেচনা না করে দেশের স্বার্থে আওয়ামী লীগ কি তা করতে পারবে?

২৩ আগস্ট, ২০২২ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত

copyright 2022 by tabithawal.com